Kazi Nazrul Islam Biography In Bengali: কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনী

Kazi Nazrul Islam
Kazi Nazrul Islam

কাজী নজরুল ইসলাম (Kazi Nazrul Islam) এর জীবনী : বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি, গীতিকার এবং সাহিত্যিক, বিদ্রোহী কবি রূপেই প্রধানত তার প্রতিষ্ঠা এবং পরিচিতি।

কাজী নজরুল ইসলাম এর জন্ম স্থান ও পিতামাতা: Birth Place And Parents Of Kazi Nazrul Islam

বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে 1900 খ্রিঃ 24 শে মে, বাংলা 1306, 11 ই জ্যৈষ্ঠ নজরুলের জন্ম। তার পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি। কিন্তু দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

কাজী নজরুল ইসলাম এর ছোটবেলা: Kazi Nazrul Islam’s Childhood

এই দরিদ্র পরিবারে জন্মে দুঃখ দরিদ্রের সঙ্গে সমাজের অসম ব্যবস্থার বাস্তব রূপটি প্রত্যক্ষ করবার সুযােগ ঘটেছিল নজরুলের (Kazi Nazrul Islam) বাল্যকাল থেকেই। এই সময়েই একটি বিদ্রোহী ভাব তার মনের গভীরে জন্মলাভ করেছিল এবং এই মনােভাব নিয়েই তিনি আজীবন সমস্ত অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, শােষণ, পীড়ন ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সৈনিকের মত সংগ্রাম করে গেছেন। শৈশবে গ্রামের মক্তবে সামান্য লেখাপড়ার সুযােগ পেয়েছিলেননজরুল। বাংলা ভাষার সঙ্গে আরবী ও ফারসী এই সময়ই তিনি শিক্ষা করেন। বাল্যকালেই চুরুলিয়ার পল্লী কবিদের প্রতি নজরুল অনুরক্ত হন। তিনি নিজেও মুখে মুখে কবিতা রচনা করে পল্লীবাসীদের প্রশংসা অর্জন করেন। 13-14 বছর বয়সে নজরুল উর্দু গজল গেয়ে কবিগানের আসর জমিয়ে শ্রোতাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। বাল্য বয়সেই লেটো দলের জন্য চাষার সং, শকুনি বধ পালাগান রচনা করেন। বাল্যকালে নজরুল অত্যন্ত দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। বাঁধা ধরা নিয়মে থাকা ছিল তার স্বভাব – বিরুদ্ধ। স্কুলের জীবন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি পালিয়ে গেলেন রানী গঞ্জে। এক রুটির দোকানে পাঁচটাকা বেতনে কিছুদিন কাজ করেন। সেখান থেকে জনৈক সহৃদয় দারােগার বদান্যতায় পুনরায় তার স্কুল জীবন শুরু হয়।

আরো পড়ুন: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর জীবনী

কাজী নজরুল ইসলাম এর প্রথম জীবন: Kazi Nazrul Islam’s Early Life

তিনি যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র সেই সময় শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। দেশপ্রেমের আহ্বানে নজরুল (Kazi Nazrul Islam) 1914 খ্রি 49 নং বাঙ্গালী পল্টনে সৈনিক হিসেবে যােগ দেন। বাহিনীর সঙ্গে তাকে চলে যেতে হয় করাচীতে। শুরু হল নজরুলের সৈনিক জীবন, সেই সঙ্গে তার কবি জীবনও। করাচীর সেনা নিবাসেই দীওয়ান – ই – হাফেজ – এর কিছু রুবাই বাংলায় অনুবাদ করেন। রিক্তের বেদন বই – এর গল্পগুলিও আরব সাগরের বিজন বেলায় বসে লেখা। গান – গল্পকবিতা সে সময়ে অজস্র ধারায় নজরুলের (Kazi Nazrul Islam) লেখনী থেকে বেরিয়ে আসে। তিনি সেসব লেখা পাঠিয়ে দিতেন বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র – পত্রিকায়। যুদ্ধক্ষেত্রে লেখা রচনাগুলির শেষে লেখা থাকত হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম। ফলে হাবিলদাব কবি নামেই তিনি প্রথম জীবনে পরিচিত হয়েছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম এর রচনা: Written by Kazi Nazrul Islam

তদানীন্তন সওগাত পত্রিকায় নজরুলের লেখা বাউন্ডুলের আত্মকাহিনীতে তার জীবনের ছাপ অনেকটাই পাওয়া যায়। প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত নজরুলের (Kazi Nazrul Islam) কবিতার নাম মুক্তি, 1326 বাংলা সনে, ইং 1919 ছাপা হয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় শ্রাবণ সংখ্যায়। সেই বছরই তখনকার অভিজাত পত্রিকা প্রবাসীর পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় হাফে এর একটি রুবাইয়াৎ – এর অনুবাদ। একই বছরে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হয় ব্যথার দান ও হেনা গল্প। এই প্রেমের গল্প দুটিতে নজরুলের দেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিকতা বােরি পরিচয় পাওয়া যায়। 1919 খ্রিঃ মার্চ – এপ্রিলে 49 নং বাঙালী পল্টন ভেঙ্গে দেওয়া হলে নজরুল কলিকাতায় আসেন। নতুন বেগ সঞ্চারিত হয় নজরুলের (Kazi Nazrul Islam) কাব্য চর্চায়। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের কবি খ্যাতি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। বিদ্রোহী কবি রূপে তিনি স্বতঃস্ফুর্ত অভিনন্দন লাভ করেন দেশবাসীর কাছে। মে ভুখা হুঁ শীর্ষক প্রবন্ধ ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশের পর 1923 খ্রিঃ 16 ই জানুয়ারী রাজদ্রোহের অভিযােগে নজরুলের একবছর সশ্রম কারাদন্ড হয়। 1923 খ্রিঃ অক্টোবর মাসে নজরুলের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের প্রচ্ছদ পট এঁকেছিলেন শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারাবাস কালে জেল কর্তৃপক্ষের নির্মম আচরণের প্রতিবাদে বিদ্রোহী নজরুল হুগলী জেলে অনশন শুরু করেন। এই সময়ে বিখ্যাত গান “এই শিকল পরাছল” সহ ভাঙ্গার গান, সেবক, মরণবরণ গানগুলি রচনা করে গলাছেড়ে গেয়ে বন্দিদের প্রাণে আগুন জ্বালিয়ে দিতেন।

আরো পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর জীবন পরিচয়

নজরুলের অনশনের সংবাদে দেশের সর্বত্র ইংরাজ সরকারের বিরুদ্ধে জনরােষ ছড়িয়ে পড়ে। শিলং থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তারবার্তা করলেন, “Give uphunger strike , our literature claims you.” জেলের কর্তৃপক্ষ সেই তারবার্তা নজরুলের হাতে দেন নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন , কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র, আবদুল্লা সুরাবর্দী প্রমুখ দেশমান্য ব্যক্তিদের অনুরােধ বিফলে গেল। উনচল্লিশ দিন অনশনের পর জনমতের চাপে ও রবীন্দ্রনাথের হস্তক্ষেপে ইংরেজ সরকার বন্দিদের দাবী মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। নজরুল চল্লিশ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম এর বিবাহ জীবন ও পরিবার: Kazi Nazrul Islam’s Marriage Life And Family

1924 খ্রিঃ 24 শে এপ্রিল, 1331 সন, নজরুল (Kazi Nazrul Islam) প্রমীলা সেনগুপ্তের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। সেই বছরেই প্রকাশিত হয় বিষের বাঁশী

1925 খ্রিঃ ফরিদপুরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে কবির প্রথম পরিচয় ঘটে। কবির কষ্ঠে “চরকার গান” শুনে গান্ধীজি মুগ্ধ হন।

আরো পড়ুন: কাশীরাম দাসের জীবন পরিচয়

নিরন্তর দুঃখ – দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেও নজরুলের (Kazi Nazrul Islam) সাহিত্য সাধনা ছিল অবিরাম। একের পর এক কবিতা, গান, প্রবন্ধ রচনা করে তিনি বাংলার সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। 1926 খ্রিঃ কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। সেই সময় কবি কৃষ্ণনগরে লিখলেন কান্ডারী হুঁশিয়ার। কৃষ্ণনগরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে এই গানটি গাওয়া হয়। দেশবন্ধুর স্বরাজ পার্টির সম্মেলনে ওই সময়েই লিখে কবি গাইলেন – “ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কসে লাঙল “।

কাজী নজরুল ইসলাম এর পুরস্কার ও সম্মান: Kazi Nazrul Islam’s Awards And Honors

বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে বিদ্রোহী কবি নজরুলের (Kazi Nazrul Islam) আবির্ভাব। কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে, নিজের উদার জীবনচর্যায়, নির্ভীকতা ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামের উজ্জ্বল প্রতীকরূপে জাতির জীবনে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। 1945 খ্রিঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে জগত্তারিণী পদক পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেন। 1960 খ্রিঃ ভারত সরকার পদ্মভূষণ উপাধি দেন। বহুমূল্যবান রসােত্তীর্ণ কাব্যশ্ৰষ্টা, অসংখ্য গানের রচয়িতা ও সুরকার নজরুল ইসলামের পরিচয় ব্যক্ত হয়েছে তারই একটি ভাষণে। বাংলা 1347, চৈত্রমাসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজতজয়ন্তী অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন, “দুঃখ সয়েছি, আঘাতকে হাসিমুখে বরণ করেছি কিন্তু আত্মার অবমাননা করিনি। নিজের স্বাধীনতাকে কখনাে বিসর্জন দিইনি। বলবীর চির উন্নত মম শির – একথা আমি আমার অনুভূতি থেকেই পেয়েছি”।

আরো পড়ুন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী

1928 খ্রিঃ নজরুল ব্রিটিশ গ্রামােফোন কোম্পানিতে কাজ পান। প্রথমে গানের ট্রেনার ও পরে তিনি কম্পােজারও হয়েছিলেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। তার নিজস্ব সংগীত – রীতি নজরুল – গীতি নামে পরিচিত। সবাক চলচ্চিত্রের সূচনা পর্ব থেকেই নজরুল বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। ধ্রূব, বিদ্যাপতি, সাপুড়ে প্রভৃতি ছবির সঙ্গীত রচনার সঙ্গে কাহিনী ও তিনি রচনা করেছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম এর মৃত্যু: Kazi Nazrul Islam’s Death

1939 খ্রিঃ নজরুল – জায়া প্রমীলা পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যান। কয়েক বছর পরে 1942 খ্রিঃ কবি নিজেও পক্ষাঘাতে বােধশক্তি হারিয়ে নীরব নির্বাক হয়ে যান। 1953 খ্রিঃ চিকিৎসার জন সস্ত্রীক নজরুলকে ইউরোেপ পাঠানাে হয়। 1972 খ্রিঃ বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন । কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে নীরব কবি আর স্বর ফিরে পাননি। বাংলাদেশ সরকার 1975 খ্রিঃ শহীদ দিবসে নজরুলকে একুশে পদক দিয়ে সম্মানিত করেন। 1976 খ্রিঃ 29 শে জুন চির বিদ্রোহী নজরুল ঢাকাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখানেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে কবরস্থ করা হয়।